নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু হত্যা মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে হত্যাকাণ্ডে জড়িত শ্যুটার মাসুম মোহাম্মদ আকাশের কাছ থেকে এখনো হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সম্পর্কে সন্তোষজনক উত্তর পাননি তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এই হত্যার পরিকল্পনায় কারা জড়িত, তাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
আলোচিত এই হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকে গতকালও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
মতিঝিল এজিবি কলোনির একাধিক সূত্রের দাবি, টিপু হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী বোঁচা বাবু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি মুসা। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের দু-এক দিন আগে দেশের বাইরে চলে যান। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, এরই মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে মুসাকে ধরা যায়নি। হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে তিনি দেশের বাইরে চলে যেতে পারেন।
মুসা একসময় মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার আব্বাসের হয়ে কাজ করতেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ আমলে তাঁর মতিঝিল এলাকায় আসা-যাওয়া শুরু হয়। শাহজাহানপুরে সন্ত্রাসী হাসানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। এখন তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশের হয়ে কাজ করেন। তাঁর আপন ছোট ভাইও ভাড়াটে কিলার বলে অভিযোগ রয়েছে।
গতকাল ডিবির মতিঝিল বিভাগের তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, মাসুমকে আদালতের মাধ্যমে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তবে তিনি যেসব তথ্য দিয়েছেন, তা কর্মকর্তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। হত্যাকাণ্ডের সময় মাসুমের মোটরসাইকেল যিনি চালাচ্ছিলেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারলে অনেক তথ্য মিলবে।
মাসুম ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের সম্পর্কে যা জানা গেছে
২০০৭ সালে সবুজবাগ থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক শরীফ হত্যা মামলার আসামি মাসুম। এর পর থেকে তিনি অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এলাকায় বখাটেদের সঙ্গে চলাফেরার কারণে এ ঘটনার আগেই তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেন তাঁর বাবা। তার পর থেকে পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নেই।
ডিবির কর্মকর্তারা বলেন, ১৬-১৭ বছর বয়স থেকেই মাসুম অস্ত্র চালনায় পারদর্শী। সবুজবাগ থানা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক শরীফকে তিনি গুলি করেন। ছাত্রলীগের হাবিব নামের এক নেতাকেও গুলি করার কথা বলেছেন তিনি। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত চারটি মামলার তথ্য রয়েছে। স্বল্প ও মিষ্টভাষী এই শ্যুটার নিজেকে সব সময় লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। বয়োজ্যেষ্ঠদের সব সময় মান্য করে চলেন। তাঁকে যারা চেনে, সবাই নম্র-ভদ্র হিসেবেই জানে। তিনি মূলত মতিঝিলকেন্দ্রিক আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম শ্যুটার। টিপুকে হত্যার আগের দিন তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন, পাঁচ-সাত দিন তিনি বাসায় যাবেন না। তারপর হত্যার ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ দেখে স্ত্রীই তাঁকে শনাক্ত করেন। পরে গত রবিবার বগুড়া জেলা পুলিশের সহায়তায় একটি আবাসিক হোটেল থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মাসুম রাজধানীর গোড়ান এলাকায় আড্ডা দিতেন। গোড়ানের বেউবাজার এলাকায় তাঁকে প্রায়ই দেখা যেত। খিলগাঁও এলাকার এক কমিশনারও তাঁকে চিনতেন জানিয়ে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, গোড়ান এলাকায় আড্ডা দিতেন বোঁচা বাবু হত্যা মামলার আসামি নাসির। এই নাসিরই শ্যুটার মাসুমকে ভাড়া করেন।
ওই সূত্র আরো জানায়, মাসুমকে মোটরসাইকেল দেন নাসির। অস্ত্র দেন কাইল্যা পলাশ। বোঁচা বাবু হত্যা মামলার আরেক আসামি এক রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠ নাসির।
এখন পর্যন্ত তদন্তে ডিবি যা পেয়েছে
ডিবির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার রিফাত রহমান শামীম কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মাসুম নিজেই গুলি করেছেন বলে স্বীকার করেছেন। তবে তিনি কার নির্দেশে, কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, সেসব বিষয়ে সন্তোষজনক উত্তর দেননি।
শামীম আরো বলেন, শুধু মামলা থেকে অব্যাহতির কারণে গুলি করেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মাসুম দাবি করলেও সেটি যৌক্তিক মনে হয়নি। তাঁকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
মাসুম নিখুঁত শ্যুটার, ঠাণ্ডা মাথার খুনি জানিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট ডিবির আরেক কর্মকর্তা বলেন, তাঁকে যাঁরা ব্যবহার করেছেন, তাঁরা আরো ভয়ংকর। এ জন্য এই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত হত্যার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে জানা যাচ্ছে না।
Leave a Reply